|
| ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের বিষাক্ত ছোবল ও সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশ। |
আমাদের কাছে বৈশাখ এখন কেবলই নতুন রঙিন পাঞ্জাবি, আলপনা আঁকা রাজপথ আর কিছু কৃত্রিম উল্লাসের প্রদর্শনী। অথচ উৎসবের এই বাহ্যিক জাঁকজমকে আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি আমাদের অস্তিত্বের শেকড়। বাস্তবতা হলো, যে নদী আর মাটির সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের এই নববর্ষ, সেই নদীর প্রাণভোমরা আজ ভয়াবহ বিপদের মুখে রয়েছে।
আমার কাছে বৈশাখ মানে একবুক হাহাকার
যে বৈশাখ আসার কথা ছিল নদীর উত্তাল ঢেউ আর কালবৈশাখীর তাণ্ডব নিয়ে, সেই বৈশাখ এখন আসে শুধু এক বুক হাহাকার আর খাঁ খাঁ বালুচর নিয়ে। অথচ আমরা ইলিশ আর পান্তার কৃত্রিম আভিজাত্যে এতটাই বুঁদ হয়ে আছি যে, পায়ের নিচের মাটি যে মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে, সেটা খেয়ালই করছি না। নদী শুকিয়ে মরে যাচ্ছে, অথচ আমরা সেই নদীর গান গেয়েই উৎসব করছি। যে তৃষ্ণার্ত নদীগুলো ইলিশের সামান্য জলটুকু জোগান দিতে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, আমরা সেই নদীর ইলিশ খেয়েই বৈশাখের উৎসব করছি। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?যখন একটা দেশের মানচিত্রের শিরা-উপশিরা তথা নদীগুলো শুকিয়ে যায়, তখন তার সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। ফারাক্কার এই নীল দংশন আড়াল করে আমরা যে আনন্দ করছি, তা আসলে এক ধরণের আত্মপ্রতারণা। নদী না বাঁচলে বৈশাখী মেলা কেবল একটা ফাঁপা প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের এখন উৎসবের চেয়ে অস্তিত্বের লড়াইটা বেশি জরুরি।
আমার মানচিত্রের শিরায় বিষদাঁত কেন?
বৈশ্বিক উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন বুকটা ফেটে হাহাকার হয়ে যায়। গত কয়েক দশকে ফারাক্কা নামক যে বিষফোঁড়া আমাদের পিঠে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তা আজ আমাদের অস্তিত্বকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে যে মানচিত্র কিনেছিলাম, সেই মানচিত্রের শিরা-উপশিরা তথা নদীগুলোকে আমরা রক্ষা করতে পারছি কি না, তা আজ বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে পর্দার আড়ালে এক রহস্যময় নীরবতা কাজ করছে। অথচ এই বিএনপিও একসময় ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা এবং পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপির প্রথম পদক্ষেপ এটি হওয়া উচিৎ ছিল যা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবী। কিন্তু কেন তা হয়ে উঠেনি? আজকের এই দীর্ঘ বিশ্লেষণে ফারাক্কার ধ্বংসলীলা, তিস্তার রুদ্ধশ্বাস রাজনীতি এবং বর্তমান সময়ের অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের নাড়িনক্ষত্র উন্মোচন করবো ইনশা-আল্লাহ।
|
| ফারাক্কা ব্যারেজ যেভাবে আমাদের নদী-নালা, প্রকৃতি, মানুষ, বন-জঙ্গল, ও পশু-পখী উজাড় করে দিয়েছে। |
ফারাক্কা: একটি নীরব গণহত্যার মহাকাব্য
১৯৭১ সালের পর যখন আমরা রক্তে ভেজা মানচিত্র নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, ঠিক তখনই আমাদের অগোচরে গঙ্গার হৃৎপিণ্ড চিরে ভারত গেঁথে দিয়েছিল ফারাক্কা নামক এক বিষাক্ত পেরেক। এটি কেবল পাথর আর কংক্রিটের কোনো জড় কাঠামো ছিল না; বরং তা ছিল সদ্য স্বাধীন এক সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধূলিসাৎ করে দেওয়ার এক সুগভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নীলনকশা।১৯৭৫ সালের সেই ঐতিহাসিক শুষ্ক মৌসুমে যখন পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধটি চালু হয়, তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের বিনাশের গল্প। আমাদের টলমলে এই পদ্মার বুকে নেমে এলো বিনাশের এক কালো ছায়া। ফারাক্কার সেই অবরুদ্ধ জলধারা কেবল আমাদের নদীকে শুষে নেয়নি, বরং কেড়ে নিয়েছে এক জাতির বেঁচে থাকার স্বপ্ন আর সার্বভৌমত্বের নিশ্বাস। ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
ভারতের নোংরা রাজনীতির বলি ৬ কোটি মানুষ
গভীর গোয়েন্দা তথ্য ও পরিবেশগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারত এই বাঁধকে একটি ‘হাইড্রো-পলিটিক্যাল উইপন’ বা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। শুষ্ক মৌসুমে তারা পানি আটকে রাখে। ফলে পদ্মা নদী সহ এর শাখা নদীগুলোর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তীব্র সেচ সংকট, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরসহ প্রায় ৬ কোটি মানুষ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এত নিচে নেমে গেছে যে, রাজশাহী ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে এখন সাধারণ নলকূপে পানি পাওয়া এক অলৌকিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।ফারাক্কার এই কালো থাবায় আমাদের গর্বের প্রতীক সুন্দরবন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এটি শুধুমাত্র পরিবেশগত ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢালকে দুর্বল করে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী নীল নকশা। যখন বঙ্গোপসাগর থেকে ঘূর্ণিঝড়, সিডর বা আইলার মতো দুর্যোগ ধেয়ে আসে, তখন এই দুর্বল হয়ে যাওয়া সুন্দরবনই আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: পরিবর্তনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য এক মরণপণ লড়াইয়ের নাম। তিস্তা নদী হলো উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য জীবন ও মরণ। অথচ গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ভারত এই নদীর টুঁটি চেপে ধরে আছে। আর ভারতের সেই নোংরা রাজনীতির কারণে এই এলাকায় বসবাসরত ৬ কোটি মানুষ পানির অভাবে হাঁসফাঁস করছে। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। এই ব্যাপারে তার কোনো মাথা ব্যথা নাই।এই সংকট নিরসনে যখন কয়েক বছর আগে ‘তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা সামনে এল, তখন থেকেই শুরু হলো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের এই পরিকল্পনা রুখে দেওয়ার নীলনকশা। চীন এই প্রকল্পে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে বসে আছে।
তাদের ইঞ্জিনিয়াররা নদীর ড্রেজিং, দুই তীরে আধুনিক শহর এবং কৃষিকাজের জন্য বিশাল জলাধার তৈরির নীল নকশা তৈরি করেছে। আর ঠিক এখানেই শুরু হয়েছে আসল থ্রিলার। ভারতের ‘র’ (RAW) এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোনোভাবেই চায় না যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চীনের পদচারণা ঘটুক। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আপত্তি ভারতের।
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি
যে ভারত বাংলাদেশ ও আমাদের জনগণকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে, তাদের আপত্তির কারণে দেশের মানুষের জীবন-মরণের সমস্যাগুলো জিইয়ে রাখা হচ্ছে। অথচ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। মূলত চীনা কারিগরি সহায়তায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই প্রকল্পটির নকশা রেডি করা হয়েছে, যার প্রধান লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীর দীর্ঘস্থায়ী শাসন এবং এর দুই তীরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা।এই মহাপরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হলো নদী খননের মাধ্যমে এর গভীরতা বৃদ্ধি এবং প্রশস্ততা কমিয়ে আনা, যার ফলে প্রতি বছর বর্ষাকালে বন্যা ও নদী ভাঙনের যে ভয়াবহতা তৈরি হয়, তা স্থায়ীভাবে নিরসন করা সম্ভব হবে। এছাড়া নদী শাসনের মাধ্যমে উদ্ধার করা হবে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমি, যেখানে আধুনিক কৃষি খামার, শিল্পপার্ক এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অস্তিত্বের লড়াইয়ে আমরা কতদূর?
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলায় শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দূর করতে বিশাল জলাধার তৈরি করা হবে, যা থেকে খাল খননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এতে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে এবং দারিদ্র্যতা চিরতরে বিদায় নিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।তবে এই বিশাল সম্ভাবনাময় পরিকল্পনাটি বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে থমকে আছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন কারিগরি ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাছাড়া উত্তরের কয়েক কোটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এটি সফল হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নদী ব্যবস্থাপনার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


