হামে আক্রান্ত মানেই মৃত্যু নয়, যা জানা সবার জন্য জরুরি

Khomota
0


হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হামের প্রকোপ এবং এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর খবর আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। টিকা না থাকা বা টিকা দিতে না পারার মতো পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত হওয়ার পর জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

হামের টিকা দেওয়া না হলে করনীয়

টিকা হলো হাম প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি টিকা দেওয়া সম্ভব না হয় বা টিকার সরবরাহ না থাকে, তবে নিম্নলিখিত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক:

সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতা

হাম বায়ুবাহিত ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টিকা না দেওয়া থাকলে শিশুকে জনাকীর্ণ স্থান, গণপরিবহন বা হাসপাতালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখা উচিত। বাড়ির আশেপাশে কেউ আক্রান্ত থাকলে শিশুদের সেখান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে।

উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ নিশ্চিত করা

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ভিটামিন-এ শরীরে হামের ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন-এ হামে আক্রান্ত শিশুদের ৫০ শতাংশ মৃত্যু ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। যে এলাকায় টিকা নেই বা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, সেখানে শিশুদের পর্যাপ্ত ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: রঙিন ফলমূল, শাকসবজি, ডিমের কুসুম ও কলিজা) খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গুলোতে ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের প্রাপ্যতা সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি

শিশুদের হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো এবং তাদের খেলনা বা ব্যবহৃত সামগ্রী নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন। পরিবারের কোনো বড় সদস্য বাইরে থেকে এলে ভালোভাবে হাত-মুখ ধুয়ে বা পোশাক পরিবর্তন করে তবেই শিশুর সংস্পর্শে আসা উচিত।

হামে আক্রান্ত হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপসমূহ

হামে আক্রান্ত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়, বরং সঠিক সেবার অভাবে তৈরি হওয়া জটিলতাই প্রাণহানির কারণ হয়। আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচাতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:

চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ভিটামিন-এ ডোজ গ্রহণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীর বয়সভেদে উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সেবন করানো বাধ্যতামূলক। এটি হামের কারণে সৃষ্ট চোখের ক্ষতি ও জটিল নিউমোনিয়া প্রতিরোধে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। এটি রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে দেয়।

পানিশূন্যতা রোধ ও সঠিক পুষ্টি সরবরাহ

হামের সময় উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই রোগীকে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি, ফলের রস, ডাবের পানি এবং খাবার স্যালাইন (ORS) খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। নরম ভাত, ওটস, সুজি, পাকা কলা, পেঁপে, সেদ্ধ ডিম, মাছ, এবং পাতলা ডাল অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াতে হবে।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মাধ্যমিক সংক্রমণ রোধ

তীব্র জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছুক্ষণ পরপর কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া (Sponging) প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো শক্তিশালী ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। তবে যদি কানে ব্যথা, তীব্র কাশি বা পেটের সমস্যা দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে সেকেন্ডারি ইনফেকশন হচ্ছে, যার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ ও বিপদচিহ্ন শনাক্তকরণ

হামে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করা উচিত নয়। যদি রোগীর নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি বিভাগে নিতে হবে:

শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা বুক দেবে যাওয়া।

অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা চেতনা হারানো।

চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা ঝাপসা দেখা।

তীব্র খিঁচুনি বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।

সচেতনতা ও মানবিক দায়িত্ব

হাম একটি সামাজিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। যদি কোনো শিশু বা ব্যক্তি আক্রান্ত হন, তবে তাকে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে ও আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্নভাবে) রাখা উচিত। এটি কেবল রোগীর দ্রুত সুস্থতার জন্য নয়, বরং রোগটি যাতে অন্য কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করার জন্য একটি মানবিক দায়িত্ব।

এটা বিচলিত হওয়ার সময় নয়

টিকার অভাব বা প্রাদুর্ভাবের সময় বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ও সচেতনতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বিপদের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই জীবন বাঁচানোর শ্রেষ্ঠ উপায়।
ধামরাইয়ে ৭ বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে মারধর, চোখে দেওয়া হয়েছে ‘সুপার গ্লু’
আরও পড়ুন →
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!