৭১ সালে বিএনপির জন্মই হয়নি, ৭১ তাদের হয় কিভাবে? : আমীরে জামায়াত

Khomota
0
জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান
আজ এক মতবিনিময় সভায় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা এবং বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। বক্তব্যের শুরুতেই ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালকে দেশের ইতিহাসে এক 'ভয়াবহ খুনের রাজনীতির' অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ নিজ দেশের দেশপ্রেমিক মানুষের রক্তে নিজেদের হাত রাঙিয়েছে। তবে তাদের এই শাসনের সমাপ্তি হয়েছে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে কোনো শাসক এভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। মৃত্যুর চাইতেও পালিয়ে যাওয়া আরো বেশি অপমানজনক বলে তিনি মনে করেন, আর সেই অপমানই তাদের কপালে জুটেছে।

জমলুম যেভাবে জালিম হয়ে উঠছে

ড. শফিকুর রহমান বর্তমান সংসদকে 'মজলুমদের মিলনমেলা' আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সংসদের প্রায় প্রত্যেক সদস্যই বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের হাতে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। নিপিড়ীত হয়েছেন। মজলুম তো মজলুমের কষ্ট বুঝার কথা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর অনেকেই তাদের অতীত ভুলে গেছেন। ক্ষমতার 'সোনালী ঘোড়া'র নেশায় মত্ত হয়ে অনেকে এখন সেই জুলাই যোদ্ধাদের ত্যাগকে তুচ্ছজ্ঞান করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যারা নিজেরা এক সময় জুলুমের শিকার ছিলেন, আজ তারাই ক্ষমতার দম্ভে জালিমের পথে হাঁটছেন।

জাতির সাথে প্রতারণার অভিযোগ ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে

জামায়াতে ইসলামীর আমির বর্তমান সরকারের কয়েকজন প্রতিনিধির সাম্প্রতিক মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে সংসদ গঠনে 'ইঞ্জিনিয়ারিং' বা কারচুপি হয়েছে। লন্ডনে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুস 'ট্রফি' তুলে দিয়ে এসেছেন।

তিনি মন্তব্য করেন, এটা যদি সত্য হয়, তবে এটি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি চরম অবমাননা করা হয়েছে। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, "আন্দোলন যে ছাত্ররা করেছে, তারা এবং তাদের অভিভাবকরা যাকে চাইবে, সেই ক্ষমতায় বসবে।" অন্য কোনো উপায়ে বা 'ইঞ্জিনিয়ারিং' করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা সফল হবে না।

গাদ্দারি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে

তার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা। শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি জাতির সাথে প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি শুরু করেছে। তারা এক সময় ৩১ দফা সংস্কারের কথা বললেও এখন সুকৌশলে তার বিপরীত অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়া এবং গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াকে 'জাতির সাথে গাদ্দারি' হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন "বিএনপি যখন বলে ৭১, ৯০ বা ২৪—সবই তাদের ক্রেডিট, তখন বাকি যোদ্ধাদের অবস্থান কোথায় থাকে?" ১৯৭১ সালে বিএনপির জন্মই হয়নি, অথচ তারা সব কৃতিত্ব নিজেদের বলে দাবি করতে চায়। জিয়াউর রহমানকে সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, একক ক্রেডিট কাউকে দিয়ে দিলে অন্যদের ত্যাগের অমর্যাদা করা হয়। তিনি বর্তমান বিএনপিকে 'আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কায়দায়' একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করেন।

কেন জামায়াত এনসিপি বারবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছেন?

ড. শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, সংসদে ৭০ ভাগ মানুষের রায় বা গণভোটের দাবি উত্থাপন করা হলেও তা গায়ের জোরে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে আসলে 'পারিবারিক বা দলীয় শাসন' পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চলছে। মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন বা পিএসসি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টার প্রতিবাদে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন।

জুলাই যোদ্ধারা এখনো যুদ্ধ করতে প্রস্তুত


তিনি জুলাই যোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে বলেন, ​আপনাদের অন্তরের ব্যাথা একেবারেই শতভাগ বুঝতে পারবো না। এটা ইমপসিবল। কারণ আমার কোন সন্তান ২৪-এ শহীদ হয়নি। আমি নিজে গুলিতে আহত হইনি। আমার হাত পা ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়নি। সুতরাং যাদের কলিজার টুকরা শহীদ হয়েছে যারা লড়াই করতে গিয়ে নিজেরা আহত হয়েছে তাদের দুঃখটা তারাই ১৬ আনা বুঝতে পারবে, আমি পারব না। কিন্তু মানুষ হওয়ার কারণে আল্লাহ যে মানবিক মনটা দিয়েছেন এইটা দিয়ে চেষ্টা করি যে দেখি এ দুঃখী মানুষগুলো আর কিছুটা হলেও দুঃখ বুঝতে পারি কিনা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন যোদ্ধাদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এক যোদ্ধার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন যোদ্ধা তার এক হাত এবং এক পা নেই, সেও এখনো দেশের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, সংসদে বিল পাসের সময় এই যোদ্ধাদের দর্শক গ্যালারিতে বসিয়ে এক ধরণের 'ব্ল্যাকমেইলিং' বা নাটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই অন্ধকারে রেখে জুলাই যোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করা হয়েছে।

জনগণকে সাথে রাজপথে ফেরার ইঙ্গিত জামায়াতর

বক্তব্যের শেষে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সংসদ নয় বরং রাজপথই তাদের মূল ঠিকানা। আমরা আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি যতদিন সংসদের ভিতরে লড়াই করতে পারবো ততদিন থাকবো এর বাইরে এক মিনিটও থাকব না। রাজপথ আমাদের মূল ঠিকানা সংসদ আমার মূল ঠিকানা নয়। সংসদে এদেশের দুঃখী জনগণ একটা পরিবর্তনের আশায় আমাদেরকে পাঠিয়েছে। সেই পরিবর্তনের সূচনা যদি আমরা না করতে পারি সেই সংসদ দিয়ে আমাদের কি হবে?

অবশ্যই আল্লাহ চাইলে আমরা জনগণের চাহিদা জনগণের ক্ষুধা পূরণের সাথেই থাকবো এর বাইরে যাব না ইনশাআল্লাহ। আপনারা আশ্বস্ত করেছেন আমরা শক্তি পেয়েছি। একসাথে লড়বো ইনশাআল্লাহ এবং আমরা দৃঢ় আস্থাশীল ফ্যাসিবাদ পরাজিত হবে চূড়ান্তভাবে, আর বিজয় হবে জনগণের। এই বিজয়ে কোন আপোষ নাই আমরা একসাথে থাকব। আল্লাহ আমাদেরকে একসাথে থাকার তৌফিক দান করুন।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে বিএনপির প্রাণপণ চেষ্টা, আন্দোলনের ঘোষণা জামায়াতের
আরও পড়ুন →

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!