![]() |
| ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেত এস আলম গ্রুপের বিক্ষোভ |
এরা এস আলমের ব্যাংক লুটের সহযোগী
রোববার সকাল থেকেই মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের দাবি— এস আলম গ্রুপের হাতে ব্যাংকের দায়িত্ব হস্তান্তর এবং চাকরি ফেরত। তবে এই আন্দোলনের নেপথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের সিংহভাগই চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার বাসিন্দা, যা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নির্বাচনী এলাকা।তবে এর গভীরে লুকিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য: গত দুই দিনে কয়েক ডজন বাসে করে পটিয়া থেকে কয়েক হাজার মানুষকে বিক্ষোভের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আনা হয়েছে। শনিবার রাতে তারা রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করেন। অভিযোগ উঠেছে, এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ একটি সিন্ডিকেট মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এই ‘ভাড়াটে’ আন্দোলনকারীদের জড়ো করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য—বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদকে অস্থিতিশীল করা।
এস আলম গ্রুপের ‘লুটরাজ
ব্যাংকিং খাতের সূত্রগুলো বলছে, গত এক দশকে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকসহ মোট ৭ থেকে ৮টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। তাদের দুর্নীতির চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা একে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এমনকি কোন জামানত ছাড়াই ১২টি কোম্পানির ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা লুট করে নেয় এস আলম গ্রুপ।এমনকি ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তিদের চাকরিতে যোগাদান করানো হতো। এবং তাদের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আইটি বিভাগকে ব্যবহার করে কোনো নথিপত্র ছাড়াই ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে লুটপাট চালাতো। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে দেখা গেছে, কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকেই ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের মানুষের আমানতের টাকায় এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের সিঙ্গাপুরে তিনটি বিশাল হোটেল এবং বিলাসবহুল শপিং মল কিনেছেন। সম্প্রতি হাইকোর্টের এক নির্দেশে এসব সম্পদের তদন্ত শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের ব্লু-প্রিন্ট
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি। ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও এমডিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপরই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য পদে বসানো হয়েছিল এস আলমের নিকটাত্মীয়দের।যেকারণে যোগ্যতা, দক্ষতা তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয় কেবল পটিয়ার বাসিন্দা হওয়ায়। এদের মধ্যে অনেকেই ভুয়া সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন, যা সাম্প্রতিক ব্যাংক অডিটে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে এক পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক বানিয়ে সুশাসন সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করা হয়।
কেন চাকরি হারিয়েছেন এসব কর্মীরা?
আন্দোলনকারীরা ‘অন্যায়’ ছাঁটাইয়ের অভিযোগ করলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ অডিট অনুযায়ী:- ভুয়া সনদ: প্রায় ১,৫০০ কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে জালিয়াতি পাওয়া গেছে।
- মূল্যায়ন পরীক্ষায় অকৃতকার্য: পেশাগত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আয়োজিত পরীক্ষায় যারা অংশ নেননি বা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদেরকেই ছাঁটাই করা হয়েছে।
- আমানতকারীদের নিরাপত্তা: লুটেরা গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ কর্মীদের ব্যাংকে রাখলে আমানতকারীদের জমানো টাকা আবারও চুরি হওয়ার ঝুঁকি থাকায় এই পদক্ষেপ অনিবার্য ছিল।
বর্তমানে কি ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে?
আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বতন্ত্র পরিচালক ও দক্ষ ব্যাংকারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমান প্রশাসন বলছে,ইতিমধ্যে লুট হওয়া অর্থের বিশাল একটি অংশ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া চলছে। এস আলম ও তার পরিবারের ১,৩৬০টিরও বেশি ব্যাংক হিসাব ইতিমধ্যে জব্দ করেছে আদালত।
জনস্বার্থ বনাম লুটেরা
আমানতকারীদের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন— “যে গ্রুপটি সাধারণ মানুষের ২ লাখ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছে, তাদের হাতে ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়?” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আন্দোলন মূলত এস আলমের পাচারকৃত অর্থ বাঁচানোর এবং পাচারকারীদের দেশে ফেরার পথ সুগম করার এক মরিয়া চেষ্টা। মতিঝিলের এই আন্দোলনের পেছনে থাকা অর্থদাতার সন্ধান করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাছাড়া পটিয়া থেকে ভাড়া করে আনা এই লোকগুলো জনমনে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আছে। একদিকে পঙ্গু হয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাতকে টেনে তোলার চেষ্টা, অন্যদিকে শক্তিশালী লুটেরা সিন্ডিকেটের মরণকামড়। মতিঝিলের এই তথাকথিত আন্দোলনের ভাড়াটে লোকেরা কেবল এস আলমের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, এ দেশের সাধারণ মানুষের নয়। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এই অশুভ শক্তির কাছে মাথানত করে, তবে দেশের অর্থনীতি এক গভীর অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হবে বলে মনে করছেন দেশের অধিকাংশ জনগণ।

