নির্বাচন আদায় করে নিতে জুলাই সনদে সাক্ষর করেছি, কবরের মতো একটা ৫ ফিট বাই ১০ ফিট জায়গায় গুম থেকেছি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিস্ফোরক ভাষণ। আওয়ামী আমলের ৩০ লক্ষ কোটি টাকা পাচার ও জুলাই জাতীয় সনদের আইনি বৈধতা নিয়ে তুললেন..
নির্বাচন আদায় করে নিতে জুলাই সনদে সাক্ষর করেছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নির্বাচন আদায় করে নিতে জুলাই সনদে সাক্ষর করেছি  সংসদে  ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
​বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এক ঐতিহাসিক ও বিস্ফোরক বক্তৃতা প্রদান করেছেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রায় ৪০ মিনিটের এই দীর্ঘ ভাষণে তিনি যেমন ইমোশনাল হয়ে নিজের গুম ও নির্বাসনের কথা বলেছেন, তেমনি আইনি যুক্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

​স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতার মূল সুর ছিল—বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হতে না দেওয়া। তবে তার বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

​রাষ্ট্রপতিকে ‘অভিভাবক’ ভূমিকার স্বীকৃতি

​বক্তৃতার শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত সময়কালকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে যখন কোনো সরকার ছিল না, সংসদ ভেঙে গিয়েছিল, তখন রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভাইজারি রোলের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়েছে, তা সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছে।

​জুলাই জাতীয় সনদ ও ‘সংবিধান সংস্কার’ বিতর্ক

​বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের আদেশ নিয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, "বিএনপি জুলাই সনদ থেকে সরে যায়নি, বিএনপি এই সনদকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার ছোট বন্ধু নাহিদ সাহেবরা সই করেছেন, ২৬টি দল সই করেছে। কিন্তু সেখানে নোট অফ ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দেওয়ার সুযোগ ছিল এবং আমরা আমাদের নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছি।"

​তিনি প্রশ্ন তোলেন, "রাজনৈতিক সমযোতার বাইরে গিয়ে হঠাৎ করে আকাশ থেকে একটা ‘নাজিলকৃত’ অর্ডিন্যান্স কেন জারি করা হলো? রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এমন একটা আদেশ ইস্যু করা হয়েছে যা সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। রাষ্ট্রপতি অর্ডিন্যান্স দিয়ে সংবিধানের কোনো ধারা সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন না। এটি ‘ফ্রড অন কনস্টিটিউশন’।"

​তিনি আরও বলেন, "জুলাই জাতীয় সনদের নামে গণভোট করা হলো, কিন্তু সেই গণভোটে জুলাই সনদের অনেক অংশ বাদ দিয়ে অবৈধ জুলাই আদেশের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করা হলো। এটা তো জালিয়াতি! আমরা বলেছি, আমরা জুলাই সনদের বাইরে কিছু মানি না।"

​আওয়ামী লীগকে ‘জাতীয় বেঈমানি’ দাবি

​বক্তৃতার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তীব্র আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণকে ইঙ্গিত করে তাদের ‘জাতীয় বেঈমান’ বলতে চেয়েও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

​আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের শ্বেতপত্রের তথ্য উপাত্ত দিয়ে বলেন, "২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই আওয়ামী রেজিমের সময় ৩০ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ৩০ লক্ষ কোটি টাকা! আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন?

এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে ১৪টি মেট্রো রেল সিস্টেম করা যেত, ২৪টি পদ্মা সেতু বানানো যেত। আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেটকে তিনগুণ করা যেত।" ​তিনি তীব্র শ্লেষের সাথে বলেন, "সোশ্যাল সেফটি নেটওয়ার্কের নামে তারা বড়লোকদের টাকা দিয়েছে। গরিবের হক মেরে আওয়ামী লীগের দোসররা বিদেশে পাচার করেছে। এখন আমরা বাহাস করছি কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে না? আসুন সবাই মিলে এই পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করি।"

​ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও জুলাই বিপ্লব

​বক্তব্যের এক পর্যায়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, "এই সংসদে কথা বলবো বলে কতো কাল অপেক্ষা করেছি! আমার ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষা ছিল ১৯ বছরের। মাঝখানে কতো পানি গড়িয়েছে, কতো রক্ত ঝরেছে। আমি নিজে গুম হয়ে নির্বাসনে থেকেছি সাড়ে নয় বছর। জেল খেটেছি বিদেশের মাটিতে।"

​তিনি আরও বলেন, "কবরের মতো একটা ৫ ফিট বাই ১০ ফিট জায়গায় আমি ছিলাম। সেই ব্যথা আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, আমি বুঝি। আজকে যারা আমাদের ডেমোক্রেটিক স্ট্রাগলকে আন্ডারমাইন করার চেষ্টা করে, তারা একদিন এই জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসকেও কলঙ্কিত করবে। একক কোনো দল বা গোষ্ঠী এই বিপ্লবের মালিক নয়, এর মালিক দেশের সাধারণ মানুষ।" এককভাবে কেউ এর কৃতিত্ব নিতে পারে না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যারা রক্ত দিয়েছে, গুম হয়েছে, সবাই এর ভাগীদার।"

​তার এই বক্তব্যকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও, জুলাই যোদ্ধাদের একাংশের কাছে এটি 'কৃতিত্ব কমানোর চেষ্টা' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

​সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার বিতর্ক

সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আসুন, রুলস অফ প্রসিউর ২৬৬ অনুযায়ী বিশেষ কমিটি করি। সেখানে জুলাই সনদসহ সবকিছু নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আপনারা বলছেন ‘সংস্কার পরিষদ’ করতে হবে। কেন? গতকাল আইনমন্ত্রী ১২ জনের নাম দিয়েছেন, আপনারা বিরোধী দল ৫ জনের নাম কেন দিচ্ছেন না? জাতি দেখল যে আমরা সংশোধন চাই, আর আপনারা সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চান।"

​তিনি কড়া ভাষায় বলেন, "পঞ্চদশ সংশোধনীর ৫টি ধারা হাইকোর্ট বাতিল করেছে। বাকি ৫০টি ধারা তো এখনো রয়ে গেছে। সেখানে একজনের ছবি টাঙানোর বিধান আছে। আপনারা কি চান আমরা এখনো সেই ছবি টাঙিয়ে রাখি? যদি সংশোধন না করেন, তবে তো সেই পুরনো সংবিধানই মেনে চলতে হবে।"

সোশ্যাল মিডিয়া ও বাকস্বাধীনতার নামে ‘অনাচার’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় কুৎসিত আক্রমণের বিরুদ্ধে ‘রিজনেবল রেস্ট্রিকশন’ বা যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ​বর্তমানে ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যে গালিগালাজ চলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। "বাকস্বাধীনতার নামে যা চলছে, তা দেখা যায় না, শোনা যায় না। পিতার সাথে কন্যাকে জড়িয়ে, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী-কন্যাকে জড়িয়ে কুৎসিত কলঙ্ক লেপন করা হচ্ছে।

ইউটিউবাররা মনে করে পৃথিবীর সব স্বাধীনতা তাদের। গালিগালাজের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য অনেকে উঠেপড়ে লেগেছে। আমাদের সামাজিক হারমনি নষ্ট হচ্ছে। আমি আইন মন্ত্রণালয়কে বলবো, রিজনেবল রেস্ট্রিকশন আনতে হবে। না হলে আমাদের কালচার নষ্ট হয়ে যাবে।"

বিরোধী দলকে উজিরে খামখা মন্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বিরোধী দলের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন নিয়ে কৌতুক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "শুনে খুব খুশি হয়েছি যে আপনারা শ্যাডো মিনিস্ট্রি করেছেন। এতে দুইটা লাভ—এক হলো দায়িত্ববোধ বাড়বে, আর দুই হলো ‘উজিরে খামখা’ বা ‘মন্ত্রী মন্ত্রী’ ভাবের একটা সুখ পাওয়া যায়। আমার কাউন্টার পার্ট হোম মিনিস্টারকে অভিনন্দন জানাই। আসুন, আমরা তথ্য বিনিময় করি।"

​তার বক্তব্য শেষে সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অভিনন্দন জানালেও বিরোধী দলীয় বেঞ্চে কিছুটা অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। তবে মাগরিবের আজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ সংসদে বিএনপি নেতা এমপি আশরাফ উদ্দিন
আরও পড়ুন →