জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ঘটনা বিরল। তা সত্ত্বেও বিরোধী দলকে আলোচনার সুযোগ দিতে এটি গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয় নিয়ে সাধারণত মুলতবি প্রস্তাব হয় না। তবে আজ আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। স্পিকারের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে না পেরে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, "নির্বাচনের আগে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই এই সংস্কারে একমত ছিল। প্রতিকার না পাওয়া মানে দেশবাসীর রায়ের প্রতিফলন না হওয়া। এই অবমূল্যায়ন আমরা মেনে নিতে পারি না।"
স্পিকার বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরার এবং পরবর্তী প্রস্তাবটি শোনার অনুরোধ জানালেও শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, তাদের মূল দাবিকে ধামাচাপা দিতেই নতুন একটি প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা বুঝে-শুনেই এই প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং ওয়াকআউট করছি।" এরপরই বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার, আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। গতকাল যখন দিবসের সর্বশেষ কর্মসূচি আলোচনা হয়, আলোচনার শেষ বক্তা ছিলেন মাননীয় আইনমন্ত্রী। তিনি তার বক্তব্যে আমাকে একটু হয়তো খেয়াল করেন নাই ভালো করে, আমার কথাটা আমার তাই মনে হয়েছে। ইনটেনশনালি উনি বলেছেন এটা আমি মনে করি না। আমি যা বলেছি, তিনি এর বাইরে গিয়ে একটু আমার সম্পর্কে বলে ফেলেছেন। গতকাল যে এজেন্ডাটা আমরা উত্থাপন করেছিলাম, এটা ছিল মূলত গণভোট এবং গণভোটের সংস্কারের যে প্রস্তাব গিয়েছিল, এর আলোকে যে পরিষদটা গঠন হওয়ার কথা, সেই পরিষদের সভা আহ্বান সম্পর্কে। এটাই ছিল মূল নোটিশের বিষয়বস্তু।
এক পর্যায়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটা প্রস্তাব এনেছেন। এই প্রস্তাবে আমার বক্তব্যে আমি রেসপন্স নিতে গিয়ে বলেছিলাম, যেহেতু আলোচনাটা হয়েছে সংস্কার পরিষদের উপর, যদি এইটাকে কেন্দ্র করে কোন বিশেষ কমিটি গঠন হয়, তাহলে আমরা ইতিবাচকভাবে সেটা ভেবে দেখবো। এবং একই সাথে বলেছিলাম যে, সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিলে এটা অর্থবহ একটা কমিটি হিসেবে রূপ নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যেহেতু আমরা এখানে এসেছি সংকট নিরসনের জন্য, সংকট তৈরির জন্য নয়।
এর উত্তরে তিনি তার কথা বলেছেন। আমার বক্তব্য যেহেতু আগে হয়ে গেছে, বিষয়টা আমি ক্লারিফাই করলাম। কিন্তু যেহেতু এটা জন-আকাঙ্ক্ষার বিষয়, গণভোটের বিষয়, প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়ের বিষয়, আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম যে আপনার মাধ্যমে প্রতিকার পাব এবং সিদ্ধান্তের জন্য আমি আপনাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত হলো কি না, আমি বুঝতে পারি নাই। এই বিষয়টা আপনার কাছ থেকে আমি স্পষ্ট জানতে চাই। ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার।
মাননীয় স্পিকার: মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, কালকের প্রস্তাবটি ছিল একটি মূলতবি প্রস্তাব। এটি আমার অনুপস্থিতিতে গৃহীত হয়েছিল। বাংলাদেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে মাত্র তিনটি মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একটি জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর, অপরটি ছিল গ্রেনেড হামলা সম্পর্কিত এবং আরেকটি ছিল নুরুল ইসলাম মনির কোস্টগার্ড সম্পর্কিত। বছর পর বছর চলে যায়, কোন মূলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয় না সংসদে। তারপরেও প্রাণবন্ত আলোচনার জন্যে ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে মূলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছিল।
আপনি জানেন যে, যেই সমস্যার সমাধান আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই কেবল করা যায়, সেটি নিয়ে মূলতবি প্রস্তাব হতে পারে না। তারপরেও উদারভাবে বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ দেবার জন্য এটি গ্রহণ করা হয়েছে। আরও একটি আমি বলতে চাই, এই সম্পর্কে আরও একটি নোটিশ, আরও একটি মূলতবি প্রস্তাবের নোটিশ আজকে আমরা বিবেচনা করব। আপনাদের মধ্যে যদি কোন কথা বলার বাকি থাকে—আমি বলেছিলাম যে বাকি কথা হলে আগামীকাল হবে—আজকেও আপনারা যদি প্রয়োজন হয় সেই নোটিশটি সম্পর্কে যখন আলাপ-আলোচনা করব, আপনাদের আরও যদি বক্তব্য থাকে, কথা বলার অবারিত সুযোগ আপনারা পাবেন।
এটি একটি জাতীয় সমস্যা, যত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে আমরা আশা করি ট্রেজারি বেঞ্চ এবং বিরোধী দল মিলে খোলাখুলিভাবে কথাবার্তা বলে সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনার মাধ্যমে আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। সেই সুযোগ আপনাদের রয়েছে। এটি মহান হাউজ অফ দি পিপল, আপনারাই ডিসাইড করবেন। রুলস অফ প্রসিডিউর অনুসারে আমরা যাতে পরিচালিত হতে পারি।
বিরোধীদলীয় নেতা: আমি প্রতিকার চেয়েছিলাম। এ বিষয়টা কোন দলের সাথে সম্পর্কিত না। যে বিষয়টা নির্বাচনের আগে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই একমত হয়েছিলাম, এর স্বপক্ষে কথাও বলেছি, ক্যাম্পেইন করেছি। আমরা প্রতিকার যে পেলাম না, এতে আমরা না, এতে দেশবাসীর তাদের রায়ের প্রতিফলন হলো না, মূল্যায়ন হলো না। আমরা বিরোধী দলে বসে এই অবমূল্যায়ন আমরা মেনে নিতে পারি না। এজন্য তার প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।
মাননীয় স্পিকার: মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, আপনি আমার বক্তব্য তো সম্পূর্ণ করতে দিলেন না। আমি আপনার পুরো বক্তব্য শুনেছি। আপনার ওয়াকআউট করা আপনাদের অধিকার। কিন্তু আমি বলতে চাই যে, আজকে একটু পরে আরেকটি মূলতবি প্রস্তাব বিবেচিত হবে। সেখানে আমার মনে হয় যে আপনি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং সেখানে মন খুলে আপনারা আরও কথা বলতে পারবেন। সুতরাং আমার অনুরোধ হলো আপনারা ওটা শোনেন, তারপরে যদি ওয়াকআউট করতে চান প্লিজ ফিল ফ্রি। তবে প্রস্তাবটির ভাগ্য কি নির্ধারণ হয়, সেটি আপনি দেখার জন্য একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন। বিরোধী দল নেতাকে মাইক দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা: হ্যাঁ, ওই নোটিশটাও আমাদের নজরে আগে কিছুটা এসেছে। এবং আমরা মনে করি যে, মূল নোটিশকে চাপা দেওয়ার জন্য ওই নোটিশটা সামনে আনা হয়েছে। এজন্য দুইটার প্রতিবাদেই আমরা এই সংসদ থেকে আপাতত ওয়াকআউট করছি। আপনাকে ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার।
মাননীয় স্পিকার: মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, ধন্যবাদ। নোটিশই তো উত্থাপন হয়নি, আপনি কি করে বুঝলেন কোনটা চাপা দেওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে? অনুরোধ করছি একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। নোটিশের বিষয়বস্তু শুনেন, তারপরে আপনারা ফিল ফ্রি।
বিরোধীদলীয় নেতা: মাননীয় স্পিকার, আপনার এবসেন্সে এই হাউজে এই নোটিশটা পড়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সদস্য এটা পড়েছেন, আমরা শুনেছি। এজন্য আমরা বুঝে শুনেই বলছি যে, এই দুই কারণেই আমরা এখন ওয়াকআউট করছি। আপনাকে ধন্যবাদ।
মাননীয় স্পিকার: নিশ্চয়ই, সংসদীয় রীতি অনুযায়ী আপনারা ওয়াকআউট করতে পারেন, ফিল ফ্রি।

