ডিবি-র্যাব পরিচয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: রাজধানীতে সরঞ্জামসহ গ্রেফতার বাহিনীর প্রধান আলামিন
![]() |
| ডিবি-র্যাব পরিচয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: রাজধানীতে সরঞ্জামসহ গ্রেফতার বাহিনীর প্রধান আলামিন |
নিজস্ব প্রতিবেদক | মুইদ হাসান
রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে অপরাধে মেতে ওঠা একটি দুর্ধর্ষ চক্রের মূল হোতাসহ দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। দীর্ঘ পাঁচ মাসের নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারির পর ১ মে ২০২৬, শুক্রবার সকালে ডেমরার মেদিপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
এই অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, র্যাবের জ্যাকেট, ওয়াকিটকি এবং পুলিশের স্টিকারযুক্ত মাইক্রোবাসসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম। র্যাব সদর দপ্তরের তথ্য মতে, এই গ্রেফতারের মাধ্যমে রাজধানীতে একটি বড় ধরনের সম্ভাব্য ডাকাতির পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
যেভাবে ধরা পড়ল চক্রটি
র্যাব সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, বিগত বেশ কিছু মাস ধরে ঢাকা ও এর আশপাশের হাইওয়েগুলোতে ব্যারিকেড দিয়ে র্যাব ও ডিবি পরিচয়ে তল্লাশির নামে ডাকাতির বেশ কিছু অভিযোগ আসছিল। এসব অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে র্যাবের একটি চৌকস দল ছায়া তদন্ত শুরু করে।১ মে সকাল আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের অভিযানিক দল ডেমরা থানাধীন আমান মার্কেট মেদিপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে ডাকাতির চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের সময় চক্রের প্রধান মোহাম্মদ আলামিন ওরফে মোটা আলামিনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে বেলা ১১টার দিকে মেদিপুর বাজারের সন্নিকটে হাজী সিএনজি পাম্প এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও চক্রের মূল গাড়ি চালক মোহাম্মদ রায়হানকে।
ডাকাতির ধরণ: যেন পূর্ণাঙ্গ নকল ফোর্স
গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে যা উদ্ধার করা হয়েছে, তা দেখে খোদ তদন্ত কর্মকর্তারাও বিস্মিত। অপরাধীরা যেন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নকল ফোর্স’ তৈরি করে রেখেছিল। উদ্ধারকৃত তালিকার মধ্যে রয়েছে:
অস্ত্র ও গোলাবারুদ: ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন ও ৪ রাউন্ড গুলি। র্যাবের
পোশাক: ৬টি র্যাব জ্যাকেট ও ১টি সেনাবাহিনীর মাস্ক।
সরঞ্জাম: ২টি হ্যান্ডকাফ, ১টি ওয়াকিটকি, ১টি লেজার লাইট এবং ২টি পুলিশ ব্যাটন।
যোগাযোগ ও প্রযুক্তি: ১টি পকেট ওয়াইফাই রাউটার এবং ২টি অত্যাধুনিক স্মার্টফোন।
পরিবহন: ডাকাতিতে ব্যবহৃত ১টি মাইক্রোবাস, যাতে লাগানো ছিল ‘পুলিশ’ লেখা স্টিকার এবং ২ সেট ভুয়া নম্বর প্লেট।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সরঞ্জামগুলো প্রমাণ করে যে তারা সাধারণ কোনো ছিনতাইকারী নয়, বরং অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি খুঁটিনাটি নকল করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছিল।
জনতার বিশ্বাসকে পুঁজি করে সর্বস্ব লুট
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা তাদের অপরাধের কৌশল সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে। তারা মূলত মহাসড়ক এবং রাজধানীর নির্জন এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাত। তাদের অপরাধের প্রধান ধাপগুলো ছিল নিম্নরূপ:- ব্যারিকেড ও তল্লাশি: তারা পুলিশের স্টিকারযুক্ত মাইক্রোবাস নিয়ে কোনো যাত্রীবাহী বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি থামাত। র্যাব বা ডিবি পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশি’ করার নামে গাড়িতে প্রবেশ করত।
- অপহরণ ও ত্রাস সৃষ্টি: ইউনিফর্ম ও ওয়াকিটকি দেখে সাধারণ মানুষ কোনো সন্দেহ করত না। গাড়িতে ওঠার পর তারা অস্ত্রের মুখে ভিকটিমদের জিম্মি করে নির্জন স্থানে নিয়ে যেত।
- যৌথ অভিযানের নাটক: মাঝেমধ্যে তারা সেনাবাহিনীর মাস্ক ব্যবহার করে ‘যৌথ অভিযান’ চলছে বলে দাবি করত, যাতে মানুষ ভয়ে কোনো প্রকার প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস না পায়।
- লুটপাট ও পলায়ন: ভিকটিমদের কাছে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও দামী মালামাল লুটে নিয়ে তাদের রাস্তার পাশে ফেলে দ্রুত গতিতে পালিয়ে যেত।
পেশা যখন ডাকাতি
গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ আলামিন ওরফে মোটা আলামিন অপরাধ জগতের এক পরিচিত নাম। তার নামে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, অস্ত্র মামলা ও ছিনতাইসহ অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৭১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রধান আসামীও ছিলেন এই আলামিন। জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি পুনরায় একই ধরনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।অন্যদিকে, চালক মোহাম্মদ রায়হান এই চক্রের লজিস্টিক মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করতেন। পেশায় চালক হওয়ার সুবাদে তিনি দ্রুত গাড়ি চালিয়ে পালানো, সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে চলা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য রাখার কাজে দক্ষ ছিলেন।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে অপরাধের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের মতে, যখন সাধারণ মানুষ র্যাব বা পুলিশকে দেখে ভয় পায় বা সন্দেহ করে, তখন রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে র্যাবের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান,
"অপরাধীদের এই ছদ্মবেশ কেবল আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি বাহিনীর ভাবমূর্তির ওপর আঘাত। আমরা কঠোরভাবে এসব চক্র নির্মূলে কাজ করছি।"
কেন বারবার সক্রিয় হচ্ছে এই চক্রগুলো?
বিশেষজ্ঞরা এই অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. সরঞ্জামের সহজলভ্যতা: ভুয়া আইডি কার্ড, ইউনিফর্ম বা ওয়াকিটকি সদৃশ খেলনা বা সরঞ্জাম অনেক সময় অবৈধ উপায়ে সংগ্রহ করা সহজ হয়ে যাচ্ছে।
২. আইনি সীমাবদ্ধতা: আলামিনের মতো দুর্ধর্ষ অপরাধীরা বারবার জামিনে মুক্তি পেয়ে একই পেশায় ফিরে আসছে। এদের উপযুক্ত পুনর্বাসন বা কঠোর নজরদারির অভাব রয়েছে।
৩. প্রযুক্তির অপব্যবহার: অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এরা দ্রুত একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে এবং পুলিশের মুভমেন্ট ট্র্যাক করার চেষ্টা করে।
জনগণকে সতর্ক থাকার আহবান র্যাব সদরদপ্তরের
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে র্যাব ও ডিবি নাগরিকদের কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে:
- পরিচয়পত্র যাচাই: সিভিল পোশাকে কেউ ডিবি বা র্যাব পরিচয় দিলে বিনীতভাবে তার পরিচয়পত্র দেখতে চান।
- অফিসিয়াল ডকুমেন্ট: তল্লাশি বা গ্রেফতারের সময় ওয়ারেন্ট বা নির্দিষ্ট মেমো আছে কি না তা নিশ্চিত হোন।
- সন্দেহ হলে ৯৯৯: কোনো দলের আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে সাথে সাথে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল করুন বা নিকটস্থ থানাকে অবহিত করুন।
- জনসমাগমস্থল ব্যবহার: নির্জন রাস্তায় কোনো গাড়ি থামানোর সংকেত দিলে চেষ্টা করুন কোনো জনবহুল এলাকায় গিয়ে গাড়ি থামাতে।
রাজধানীর ডেমরায় র্যাবের এই সফল অভিযান সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়—আর কত আলামিন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে? অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। আজ তারা র্যাব সেজেছে, কাল হয়তো অন্য কোনো পরিচয়ে হাজির হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল ডেটাবেজ, যেখানে দ্রুত পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে, এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করা করা এখন জনগণের প্রাণের দাবী।
