​বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হলো, রাশিয়া থেকে আসছে বিশাল সারের চালান

রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি (MOP) সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএডিসি-র এই উদ্যোগের
রাশিয়া থেকে আসছে বিশাল সারের চালান
রাশিয়া থেকে আসছে বিশাল সারের চালান
প্রতিবেদন: শ্রেয়া ঘোষ
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির চাকা এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিশ্চয়তা আসে এই মাটির বুক থেকেই। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কৃষিকাজ আর আগের মতো সহজ নেই। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি কমছে প্রতিনিয়ত। এই কঠিন সমীকরণে আমাদের একমাত্র ভরসা হচ্ছে ফলন বাড়ানো। আর ফলন বাড়ানোর জন্য যে উপাদানটি সবচেয়ে অপরিহার্য, তা হলো গুণগত মানের সার।

​সম্প্রতি দেশের কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে এবং সারের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি দেশের কয়েক কোটি কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

সারের প্রয়োজনীয়তা: কেন এই এমওপি সার?

​কৃষিতে সারের ভূমিকা অনেকটা মানুষের শরীরে পুষ্টির মতো। বিশেষ করে এমওপি (Mourate of Potash) বা পটাশ সার ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং মান উন্নত করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ফসল যেমন ধান, গম, আলু এবং বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজির বাম্পার ফলন পেতে এই সারের কোন বিকল্প নেই।

এমওপি সার গাছের শিকড় মজবুত করে, দানা পুষ্ট করে এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলায় গাছকে সাহায্য করে। ​মাটির উর্বরতা যখন কমতে থাকে, তখন এই ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়া কাক্সিক্ষত উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই সময়মতো সঠিক পরিমাণ সার সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যেই নতুন এই আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারি অনুমোদন ও ক্রয় প্রক্রিয়ার বিস্তারিত

​গত ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক বিশেষ সভায় এই বিশাল সার আমদানির প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা, যেখানে কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

​এই সার আমদানির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে (BADC)। রাষ্ট্রীয় চুক্তির (G-to-G) আওতায় এই আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান JSC Foreign Economic Corporation Prodintorg থেকে এই সার কেনা হচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ১০ম লটের সার সরবরাহ।

​ব্যয় ও আর্থিক বিশ্লেষণ

এই চালানে প্রতি মেট্রিক টন এমওপি সারের দাম ধরা হয়েছে ৩৬৮.১৩ মার্কিন ডলার। সেই হিসেবে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানিতে বাংলাদেশের মোট ব্যয় হবে প্রায় ১৫৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। যদিও অংকটি বড় মনে হতে পারে, কিন্তু কৃষি উৎপাদনের সুফলের তুলনায় এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সারের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হলে আমাদের কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হতো।

​রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বাণিজ্যিক সম্পর্ক

​বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত জটিল হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং বেশ স্থিতিশীল। বিশেষ করে কৃষি উপকরণ এবং জ্বালানি খাতে রাশিয়া বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত অংশীদার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সরাসরি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে না কিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে কেনার ফলে সার সরবরাহের নিশ্চয়তা অনেক বেশি থাকে এবং দামও কিছুটা সাশ্রয়ী হয়। ​এই ১০ম লটের সার আমদানির ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে সফলভাবে কূটনীতি পরিচালনা করছে।

​কৃষি উৎপাদন ও বাজার স্থিতিশীলতায় এর প্রভাব

​বাংলাদেশের কৃষকরা মূলত মৌসুমভিত্তিক চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল। বোরো মৌসুম বা আমন মৌসুমের সময় যখন সারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে, তখন বাজারে সরবরাহ কম থাকলে সারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। এতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তাদের উৎপাদন খরচ মারাত্মক ভাবে বেড়ে যায়।

​যখন সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় চালান আমদানি করে মজুদ গড়ে তোলে, তখন সার সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীরা খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেনা। ফলে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামে সহজে সার সংগ্রহ করতে পারবেন। এবারের এই ৩৫ হাজার মেট্রিক টন সারের চালানটি বাজারে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে এবং আসন্ন মৌসুমগুলোতে সার সংকটের ভয় থেকে কৃষকদের মুক্তি দেবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

​বৈশ্বিক অস্থিরতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

​আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ সারের জন্য অনেকাংশেই বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) বিঘ্নিত হলে সারের দাম মুহূর্তেই বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং ডলারের দামের ওঠানামা আমদানির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

​রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে সার সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশ তা বেশ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কেবল আমদানিনির্ভরতা আমাদের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই আমদানির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

​কৃষকের জীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতি

​একজন কৃষকের কাছে তার জমিটিই হলো একমাত্র সম্পদ। তিনি যখন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাঠে ফসল ফলান, তখন তিনি চান সময়মতো সার এবং বীজ পেতে। সরকারের এই আমদানির সিদ্ধান্তটি যখন বাস্তবে রূপ নেবে এবং তার সুফল যখন কৃষকদের ঘরে পৌছাবে, তখনই এর প্রকৃত সফলতা আসবে।

​সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ করতে পারলে উৎপাদন বাড়বে, যার ফলে কৃষকের আয় বাড়বে। যখন কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, তখন পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তন হয়ে যাবে। বাজারে চাল, আলু বা সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে। অর্থাৎ, এই ১৫৬ কোটি টাকার সার আমদানির সিদ্ধান্তটি পরোক্ষভাবে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রাকে স্পর্শ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচন আদায় করে নিতে জুলাই সনদে সাক্ষর করেছি, কবরের মতো একটা ৫ ফিট বাই ১০ ফিট জায়গায় গুম থেকেছি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আরও পড়ুন →