দেশ গড়ার শ্রমিক হতে চাই: মে দিবসের সমাবেশে তারেক রহমান
মে দিবসের সমাবেশে তারেক রহমানের ঘোষণা: ক্ষমতায় গেলে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হবে। নিজেকে ‘দেশ গড়ার শ্রমিক’ হিসেবে অভিহিত করে
![]() |
| দেশ গড়ার শ্রমিক হতে চাই: মে দিবসের সমাবেশে তারেক রহমান |
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংগ্রামের স্মৃতিচারণ
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ শ্রমিকদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাদের অবদান জাতি চিরকাল মনে রাখবে।" বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শ্রমিক দলের ৭২ জন সদস্যের শাহাদাত বরণ করার কথা উল্লেখ করে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।তিনি বিগত স্বৈরাচারী শাসনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, "মাত্র দুই-তিন বছর আগেও এই রাজপথে সমাবেশ করতে আমাদের আতঙ্কিত থাকতে হতো। স্বৈরাচারের বাহিনী কখন হামলা করবে, কখন গুলি চলবে—সেই ভয়ে থাকতে হতো। কিন্তু ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা সেই অন্ধকার সময় পার করে এসেছি।"
অর্থনীতি পুনর্গঠন ও বন্ধ কলকারখানা চালুর ঘোষণা
সমাবেশের বক্তব্য থেকে 'বন্ধ কলকারখানা চালু'র দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তারেক রহমান এক বিশেষ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকার ইতিমধ্যেই বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি বলেন, "আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গত সপ্তাহেই নির্দেশনা দিয়েছি। কোন কোন কারখানা দ্রুত চালু করা সম্ভব এবং কীভাবে বেকার হয়ে পড়া হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেয়া যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। ইনশাআল্লাহ, পর্যায়ক্রমিকভাবে দেশের সব বন্ধ কলকারখানার চাকা আবার ঘুরবে।"বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
তারেক রহমান তার ভাষণে কেবল বিদ্যমান কলকারখানা চালুই নয়, বরং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, "দেশের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম করতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। আমরা বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা শুরু করেছি এবং তাদের সব ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছি। শ্রমিক ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে—এই মূলমন্ত্র নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।"হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "যানজট নিরসনে হকারদের রাস্তা থেকে সরানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদেরও পরিবার আছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে। আমরা কাউকে না খেয়ে মরতে দেব না।"
রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা
বিএনপির রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা '৩১ দফা'র কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, "আমরা আড়াই-তিন বছর আগেই রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা দিয়েছিলাম। সেখানে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।"বক্তব্যে তিনি বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন:
ফ্যামিলি কার্ড: শ্রমিক, কৃষক এবং প্রাথমিক শিক্ষকদের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রথা পর্যায়ক্রমে সবার কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।
কৃষি ঋণ মওকুফ: কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের কাজ শুরু হয়েছে এবং নতুন 'কৃষক কার্ড' বিতরণ করা হচ্ছে।
খাল খনন কর্মসূচি: পানির সমস্যা সমাধান ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে দেশব্যাপী আবারও 'খাল খনন কর্মসূচি' শুরু হয়েছে।
নতুন কুঁড়ি ও ক্রীড়া উন্নয়ন: আগামী প্রজন্মের মেধাবী খেলোয়াড় ও শিল্পী খুঁজে বের করতে দেশব্যাপী 'নতুন কুঁড়ি' প্রতিযোগিতা আগামীকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।
ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান
তারেক রহমান সতর্ক করে বলেন যে, বাংলাদেশ যখনই গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করে, তখনই দেশী-বিদেশী কিছু কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র শুরু করে। তিনি বলেন, "১২ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে একটি মহল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে বন্ধুহীন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাসী দেখছে যে, এই সরকার জনগণের সমর্থনে গঠিত। তাই তাদের চক্রান্ত সফল হবে না।" তিনি দেশের প্রতিটি মানুষকে, বিশেষ করে শ্রমিকদেরকে এই সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে ওঠার আহ্বান জানান।'করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ'
বক্তব্যের শেষের দিকে তারেক রহমান নিজেকে একজন 'দেশ গড়ার শ্রমিক' হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, "আপনারা যেমন দালান গড়েন, কারখানা চালান—ঠিক তেমনি আমি এবং আমাদের মন্ত্রিসভার সকল সদস্য নিজেদের 'দেশ গড়ার শ্রমিক' হিসেবে মনে করি। আমরা আপনাদের পাশে থেকে এই মাতৃভূমিকে নতুন করে সাজাতে চাই।"তিনি বিএনপির নতুন স্লোগান ঘোষণা করেন: "করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ"। তিনি উপস্থিত হাজারো শ্রমিকের কাছে প্রশ্ন করেন, "আপনারা কি আমার সাথে দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে নাম লেখাতে রাজি আছেন?" তখন মুহুর্মুহু করতালিতে পুরো নয়াপল্টন এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
বক্তব্যের একদম শেষ প্রান্তে এসে তারেক রহমান নয়াপল্টন এলাকার প্রতিবেশী ও দোকানদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "বিগত ১৭ বছর আমাদের আন্দোলনের সময় আপনারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমাদের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দিয়েছেন এবং পুলিশের নির্যাতনের মুখেও সাহস দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি এবং আমার দল আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।"
শহীদ জিয়ার অমর উক্তি—"প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ"—উদ্ধৃত করে তিনি তার ভাষণ সমাপ্ত করেন।
