​শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে: জামায়াতে ইসলামী

বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে রাজধানী ঢাকার সমাবেশে..
শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে: জামায়াতে ইসলামী
শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে: জামায়াতে ইসলামী

নিজস্ব প্রতিবেদক | মুইদ হাসান

​বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও তাদের জীবনমান ও অধিকার আজও তিমিরেই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই থামবে না।" বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। তার এই বক্তব্যে বাংলাদেশের শ্রমিক কৃষক ও খেটে-খাওয়া মানুষ আশার আলো দেখছেন।

​অধিকার বনাম বাস্তবতা

​রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে গার্মেন্টস, পরিবহন, নির্মাণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের হাজার হাজার শ্রমিক অংশ নেন। সমাবেশে শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষেত্রের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ—ঠিকমতো বেতন না পাওয়া এবং তুচ্ছ কারণে চাকরিচ্যুত হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও শ্রম গবেষণা সংস্থার মতে, অপর্যাপ্ত মজুরি এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ বাংলাদেশের শ্রম খাতের নির্মম বাস্তবতা।

​সংখ্যায় বড়, কিন্তু ক্ষমতায় কি সমান?

​সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন:
​"প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা হিসাব করলে দেখা যাবে, অন্যান্য সব পেশার তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মর্যাদা উপেক্ষা করে কোনো সমাজ টেকসই হতে পারে না।"

​পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে, যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও শ্রমিকরা কি তাদের ন্যায্য ক্ষমতায়ন ও অধিকার পাচ্ছেন? বাস্তব চিত্র বলছে, উত্তরটি এখনো নেতিবাচক।

​ন্যূনতম মজুরি ২৫,০০০ টাকা করার দাবি

​বর্তমানে জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের সঙ্গে শ্রমিকের আয় সংগতিপূর্ণ নয়। সমাবেশে শ্রমিক নেতারা ন্যূনতম মজুরি ২৫,০০০ টাকা করার জোরালো দাবি জানান। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঢাকা শহরে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, একজন সাধারণ শ্রমিকের আয় তার অর্ধেকও নয়। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন, যা সামাজিক অসমতাকে আরও প্রকট করছে।

​নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি

​সমাবেশে নারী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষ করে ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি তোলা হয়েছে। ​বাস্তবতা: আইনি সুরক্ষা থাকলেও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। ​শ্রমিকের ভাষ্য: "ছুটি চাইলে চাকরি হারানোর ভয়ে থাকতে হয়।" এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মানদণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

​কাঠামোগত বৈষম্য ও শোষণের চিত্র

​বক্তারা অভিযোগ করেন, শ্রমিকরা শুধু মজুরিতে নয়, বরং পদোন্নতি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্যের শিকার। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যা শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
​নীতি বাস্তবায়নে প্রধান ৩টি বাধা: 

  • প্রচলিত শ্রম আইনের প্রয়োগে শিথিলতা। 
  •  যথাযথ তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব। 
  • রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি।

​আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান

​নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা উন্নতি করলেও মজুরি কাঠামো ও শ্রমিক কল্যাণে এখনো বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দোহাই দিয়ে প্রায়ই শ্রমিকদের স্বার্থকে বলি দেওয়া হচ্ছে বলে সমাবেশে অভিযোগ করা হয়।


​সংকট উত্তরণে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ

শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে সমাবেশে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে: ​

  • বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা। ​
  • শ্রম আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন।
  • ট্রেড ইউনিয়ন করার অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ​
  • নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা স্কিম। ​

​বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু এই উন্নয়ন যদি শ্রমিকের জীবনের অন্ধকার ঘোচাতে না পারে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

​দেশ গড়ার শ্রমিক হতে চাই: মে দিবসের সমাবেশে তারেক রহমান
আরও পড়ুন →