​ছাত্রশিবির ছাত্রদল সংঘাতে কেঁপে উঠতে পারে সারাদেশ, পিছনে কারা?

Khomota
0
ছাত্রশিবির ছাত্রদল সংঘাত
​দেশের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্রগুলোতে আবারও বেজে উঠেছে অস্থিরতার সুর। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে শুরু করে কুমিল্লা পলিটেকনিক, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—সর্বত্রই এখন বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসগুলোতে আধিপত্য বিস্তার এবং 'গুপ্ত' কর্মসূচির মতো ইস্যু নিয়ে দুই সংগঠনের এই মুখোমুখি অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সংঘাতের মূলে কী?

​সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিকভাবে ফেসবুক পোস্ট বা গ্রাফিতির লেখা মোছার মতো ছোট ঘটনা থেকে সংঘাতের সূত্রপাত হলেও এর মূলে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। দীর্ঘ সময় পর ক্যাম্পাসে সক্রিয় হওয়া ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে আধিপত্য রক্ষার লড়াই ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। একদিকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগ, অন্যদিকে শিবিরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত উসকানির পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজ: গ্রাফিতি নিয়ে তুলকালাম

​গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেয়ালের একটি গ্রাফিতি। সেখানে 'ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস' লেখার মধ্য থেকে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা 'ছাত্র' শব্দটি মুছে 'গুপ্ত' লিখে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে শিবিরের এক নেতার পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই ঘটনায় শিক্ষকসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম উত্তেজনা ও ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা

​সবচেয়ে বিতর্কিত এবং উদ্বেগের ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রশিবিরের এক নেতার নামে তৈরি করা একটি ‘ভুয়া’ ফেসবুক আইডি থেকে করা কুরুচিপূর্ণ পোস্টকে কেন্দ্র করে শাহবাগ থানার ভেতরেই হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে শিবিরের আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে ঘেরাও করে ছাত্রদল। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন ডাকসুর সাবেক নেতা মুসাদ্দিক আলী এবং এবি যুবায়ের। এই ঘটনায় কর্তব্যরত ১০ জন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন, যা সাংবাদিক সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

​শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা ও উপাচার্যের উদ্বেগ

​উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "সহনশীলতা কমে যাওয়া আমাদের বড় সমস্যা। গণতান্ত্রিক সরকারের অর্জন ধরে রাখতে হলে আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।" তিনি থানার ভেতরে এ ধরনের ঘটনাকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

​রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া

​এই সংঘাত নিয়ে রাজপথের রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "যারা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে, তারা যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।"

​অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে ছাত্রদলকে ‘হায়েনার মতো লেলিয়ে দেওয়া’ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে।

​ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ

​ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের আসন্ন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা শক্তি প্রদর্শন করছে এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারে উগ্র আচরণ করছে। তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। ​বিপরীতে, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, শিবিরই পরিকল্পিতভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি শিবিরের বিরুদ্ধে বট আইডি ব্যবহার করে নোংরা প্রচারণার অভিযোগ আনেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় সাংবাদিকদের আহত হওয়ার বিষয়ে তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং পরিবেশ শান্ত রাখতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন।

​ফ্যাসিবাদী চক্রের উসকানির শঙ্কা

​অনেকে মনে করছেন, ছাত্রদল ও শিবিরের এই সংঘাতের সুযোগ নিতে পারে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির কর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থেকে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

​শিক্ষাবিদদের ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

​শিক্ষাবিদদের মতে, ছাত্রসংগঠনগুলোর এই অসহিষ্ণুতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ না নেয়, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। শিক্ষাঙ্গন যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি।
লুটপাটে দিশাহারা বিদ্যুৎ খাত, গ্রাহকদের সাথে সমন্বয়ের চিন্তা সরকারের
আরও পড়ুন →
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!